Advertisement

কেশবপুরে বাঁশ বেতের জিনিসপত্র রঙ দিয়ে নকশা তৈরি এখন বিলুপ্ত পথে

আজিজুর রহমান,কেশবপুর (যশোর) প্রতিনিধি:    |    ১৮:৪৮, মার্চ ২৩, ২০২০   |    195




কেশবপুরে বাঁশ বেতের জিনিসপত্র রঙ দিয়ে নকশা তৈরি এখন বিলুপ্ত পথে


কেশবপুরে বাঁশ বেত শিল্পী এখন বিলুপ্ত পথে দেখা দিয়েছে।তেমন আর দেখা মেলে না।
সাত সকালে ঘুম থেকে উঠেই শুরু হয় বাঁশ বেত দিয়ে কৃষি ও গৃহস্থালীর জিনিস তৈরির কাজ। চলে আবার রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত। এভাবে সারা বছরই থাকে কাজের ব্যস্ততা তাদের। পরিবারের সবাই মিলে কাজ করে তৈরিকৃত বাঁশ বেতের জিনিস পত্র বিক্রির মাধ্যমে চলে তাদের জীবন জীবিকা। প্রতিদিন কাজ থাকায় ভূমিহীন হলেও নিয়মিত আয়-রোজগারে তারা সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন কোনো ভাবে।
এমন অবস্থা কেশবপুর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা, কোমরপোল, সাগরদাড়ি, ফতেহপুর, মঙ্গলকোট, কলাগাছিসহ অনেক গ্রামের দাস সম্প্রদায়ের পরিবার গুলোতে। এ গ্রামে কমপক্ষে ৪০/৫০ টি দাস সম্প্রদায়ের পরিবার বাস করছেন। প্রায় পরিবারের ঘরের আনাচে কানাচে বাঁশ বেতের তৈরি জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। বাড়ির মধ্যে বসে বাঁশ বেত হতে ধারালো দা-বঁটি দিয়ে নিপুণ হাতে কেউ তুলছেন বেতি বা চটা। আর এগুলো দিয়ে কেউ বুনছেন চাটাই, ডোল, ঝুড়ি, ডালা, কুলাসহ বিভিন্ন কৃষি ও গৃহস্থালী জিনিসপত্র। আবার কেউ ব্যস্ত তৈরিকৃত গৃহস্থালী জিনিসপত্রে রঙ দিয়ে নকশা ও বাজারজাত করতে। কারিগররা জানান, তাদের অধিকাংশ পরিবারেরই মাঠে কোন চাষযোগ্য জমি নেই। বসত ভিটের দু’এক কাঠা জমিই তাদের সম্বল। তারপরও পূর্ব পুরুষদের বাঁশ বেতের কুটির শিল্পের পেশা আকড়িয়ে প্রতিদিনের কম বেশি আয়-রোজগারের মাধ্যমে টিকে আছেন। অনেকে হয়েছেন স্বাবলম্বী। ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া চালানোর পাশাপাশি বেশ কোন ভাবে চলছে তাদের সংসার। সংসারে আয় রোজগারের এটাই তাদের একমাত্র পেশা। পূর্ব পুরুষদের হতে ধারাবাহিক ভাবে পাওয়া এ পেশা আকড়ে ধরে বেঁচে আছেন অনেকেই। এখন তাদের মধ্যে দু’একজন অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়লেও বেশিরভাগ মহিলারা সবাই গৃহস্থালী কাজের পাশাপাশি সারা বছর ধরে বাঁশ বেতের জিনিসপত্র তৈরি করে থাকেন। আর এগুলো পাইকারেরা বাড়ি থেকেই কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। পুরুষদের কেউ কেউ আবার তৈরিকৃত কৃষি ও গৃহস্থালীর জিনিসপত্র ভ্যানসহ বহনযোগ্য যানবাহনে করে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিক্রি করেন। পরিবারের ছোট ছেলে মেয়েরা শিশুকাল হতেই লেখাপড়া চালানোর পাশাপাশি অবসর সময়ে পরিবারের বড়দের কাজে সহযোগিতা করতে করতে তারাও এ সমস্ত কাজে পারদর্শী হয়ে ওঠে। ফলে তারা সাংসারিক জীবনে গিয়ে চাকরি বা ব্যবসা না করতে পারলেও কেউ বেকার হয়ে বসে থাকে না। বরং পরিবারের পেশাটা ধরে বেঁচে থাকতে পারে। কারিগর নিমাই দাস জানান, আমার বাবা দাদারা বাঁশ বেতের কাজ করতেন। এখন আমরা ৫ ভাইয়ের সংসারেও এ কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছি। বিগত এক দশকে প্ল¬াষ্টিক ও এ্যালোমিনিয়ামের গৃহস্থালীর জিনিসপত্র দেশে ব্যাপক ভাবে প্রচলনের কারণে আমাদের তৈরিকৃত জিনিসের চাহিদায় একটু ভাটা পড়েছে। কিন্তু এলাকায় এখন পান ও সবজি চাষ ব্যাপক ভাবে বিস্তার লাভ করেছে। এগুলো বাজারজাত করতে ডোল ও ঝুড়ির চাহিদা বেড়েছে কয়েকগুন বেশি। তিনি আরো জানান, বাঁশ বেতের দাম বাড়লেও কোন প্রভাব পড়েনি। কেননা উৎপাদন ব্যয় যেহারে বেড়েছে সে হারে তারা উৎপাদিত মালামালে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করে থাকেন। ফলে তাদের কোন লোকসানের ভয় নেই। একাধিক কারিগর জানান, কৃষিকাজে অনেক সময় বৈরী আবহাওয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রভাব ফেলে। আবার কোন কোন সময়ে উৎপাদিত পন্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হই আমরা। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমাদের তৈরিকৃত কৃষি যন্ত্রপাতির চাহিদা কমে গেলেও লোকসান হয়না। বরং আমাদের এ পেশার সাথে জড়িতরা প্রতিদিনের রোজগারে তিল তিল করে নগদ পয়সা জমাতে পারেন। সেটার পরিমান বেশি না হলেও অন্য পেশার মানুষের চেয়ে আমরা খানিকটা আর্থিকভাবে সচ্ছল থাকতে পারি। বিশ্বনাথ দাস নামের এক কারিগর জানান, এখন একটি মাঝারি গোছের বাঁশ কিনতে ১৫০/২০০ টাকা খরচ পড়ে। প্রতি বাঁশ হতে ১টা ধান রাখার বড় ডোল তৈরি করা যায়। আবার ওই বাঁশ থেকে পান বাজার জাতের ডোল তৈরি করা হলে ২ টা ডোল তৈরি করা যায়। এছাড়াও প্রতিটি বাঁশ হতে ৪ টা বড় ঝুড়ি, কমপক্ষে ১০ টি কৃষকের মাথার টোপর, অথবা সর্বনিম্ন ৩’শ টাকা মূল্যের লম্বা চাটাই তৈরি করা যায়। বাজারে প্রতিটি বড় ঝুড়ি এখন ১৬০ থেকে ১৮০ টাকায়, ছোট ডালা ১০০ থেকে ১১০ টাকায়, কৃষকের মাথার টোপর ৬০ থেকে ৭০ টাকায়, ধান ও কৃষি পণ্য কৃষাণীদের হাতে ঝাড়ানোর কুলা ৫৫ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তিনি আরো জানান, বাঁশ কিনে বাড়িতে ফাড়াই করে তার প্রকৃতি দেখে বুঝে ওই বাঁশ দিয়ে জিনিস তৈরি করে থাকেন। ফাড়াইকৃত বাঁশের তিনটি স্থর থেকে তিন ধরনের জিনিস তৈরি করলে ভাল গুণগত মানসম্পন্ন টেকসই হয়। একজন অভিজ্ঞ কারিগর সারাদিন পরিশ্রম করলে প্রতিদিন ৩শ থেকে সাড়ে ৩শ টাকা রোজগার করতে পারেন। বয়োবৃদ্ধ কারিগর হরিপদ দাস জানান, বিগত ৫০ বছর ধরে বাঁশ বেত নিয়ে যুদ্ধ করছেন। এক সময়ে বাড়িতে এ সমস্ত জিনিসপত্র তৈরি করে কোন পরিবহন না থাকায় মাথায় বয়ে ৯/১০ মাইল দূরের হাটে বিক্রি করে সংসার চালিয়েছেন। সে দিনের মত এখন আর কষ্ট নেই। এখন বাড়ি থেকেই পাইকাররা এসে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। ফলে তাদের কষ্ট এখন অনেকটা লাঘব হয়েছে। তিনি আরো জানান, আগে গ্রামাঞ্চলে বন বাদাড়ে প্রধান উপকরণ বেত পাওয়া যেত। যা দিয়ে তারা নানান জিনিস তৈরি করতে পারতেন। এখন বন বাদাড় উজাড় হয়ে যাওয়ায় কাজ চালাতে বাইরের থেকে বেত কিনতে হচ্ছে। তারপরও সব মিলিয়ে তারা ভালো আছেন। এলাকার জনপ্রতিনিধিরা জানান, তার ইউনিয়নের দাস সম্প্রদায়ের মানুষেরা বাঁশ বেতের কুটির শিল্পে সংসার চালান। বেকারের ধোয়া তুলে বসে না থেকে নিজেরা স্বাধীন মত বাড়িতে বসে বিভিন্ন জিনিস তৈরি করে বিক্রি করেন। প্রতিদিনের আয়-রোজগারে তাদের মধ্যে অনেকে আজ স্বাবলম্বী হয়েছেন। আর সবচেয়ে বড় কথা আগের দিনের চেয়ে তাদের মধ্যে শিক্ষার হার বেড়েছে।

 



Advertisement

রিলেটেড নিউজ

মিঠামইন – অষ্টগ্রাম রোড : কিশোরগঞ্জ হাওর রোড ভ্রমণ গাইড

১১:৫১, নভেম্বর ১২, ২০২০

মিঠামইন – অষ্টগ্রাম রোড : কিশোরগঞ্জ হাওর রোড ভ্রমণ গাইড


দুপচাঁচিয়ায় মাঠ জুড়ে সোনালী ধানের দোলা কৃষকের মুখে হাসি

১০:১০, নভেম্বর ১২, ২০২০

দুপচাঁচিয়ায় মাঠ জুড়ে সোনালী ধানের দোলা কৃষকের মুখে হাসি


অপরুপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি ‘সন্দ্বীপ’

১৩:৫১, নভেম্বর ১১, ২০২০

অপরুপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি ‘সন্দ্বীপ’


তেঁতুলিয়া থেকে দেখা যাচ্ছে অপরূপ কাঞ্চনজঙ্ঘা 

১৮:১৪, অক্টোবর ২৯, ২০২০

তেঁতুলিয়া থেকে দেখা যাচ্ছে অপরূপ কাঞ্চনজঙ্ঘা 


দুয়ারে হাজির হেমন্ত

১১:০৩, অক্টোবর ১৭, ২০২০

দুয়ারে হাজির হেমন্ত


কেশবপুরে বাঁশ বেতের জিনিসপত্র রঙ দিয়ে নকশা তৈরি এখন বিলুপ্ত পথে

১৮:৪৮, মার্চ ২৩, ২০২০

কেশবপুরে বাঁশ বেতের জিনিসপত্র রঙ দিয়ে নকশা তৈরি এখন বিলুপ্ত পথে


চলছে সৌন্দর্য্য বর্ধনের কাজ

১৭:৩৬, জানুয়ারী ৬, ২০২০

চলছে সৌন্দর্য্য বর্ধনের কাজ


Advertisement
Advertisement

আরও পড়ুন

দ্বিতীয় বিয়ে করলেন ইভা রহমান

২০:১৪, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২১

দ্বিতীয় বিয়ে করলেন ইভা রহমান


করোনায় মৃত্যু আরও কমেছে

১৮:৫১, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২১

করোনায় মৃত্যু আরও কমেছে


ঝালকাঠিতে অসুস্থ দুই শিশুকে রাস্তায় ফেলে গেলেন মা

১৮:৪০, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২১

ঝালকাঠিতে অসুস্থ দুই শিশুকে রাস্তায় ফেলে গেলেন মা